সেই দিনটি বুধবার - হালিমাতুস সাদিয়া

নবীন দীপ্ত

চারিদিকে কুঁয়াশা। ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা হাওয়া। সপ্তাহের শেষের দিকের দিন আজ। আগামীকাল বৃহষ্পতিবার। আমি এখনো আজকের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাটা ভুলতে পারছি না। বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে যে, আমি বেঁচে আছি। আমি তো জীবনের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ঘটনাটা খুবই ভয়ঙ্কর ছিল।

আমি এবং আমার কিছু বান্ধবী মিলে দুপুরবেলায় বাড়ির দক্ষিণ দিকের বাগানে হাঁটছিলাম। আমরা ছিলাম চারজন। আমি, সামিয়া, রিমা আর আয়েশা। আমাদের বাড়ির পাশের বাগানটি অনেক বড়। ছোটবেলায় অনেক ভুঁতুড়ে গল্প শুনেছি এই বাগান নিয়ে। এখানে নাকি একটা মানুষখেকো ব্যক্তি বাস করে। কেউ এই বাগানে প্রবেশ করলে সে তাকে ধরে আস্ত চিঁবিয়ে খায়। আমরা বাগানে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে পথ হাঁরিয়ে ফেললাম, নিজেও খেয়াল করি নি। হঠাৎ নীড়ে ফেরা পাখিদের দেখে আমরা হুশে ফিরে আসলাম। হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সাড়ে পাঁচটা বাজে।

রিমা বললো, চল আমরা বাড়ি ফিরে যাই।

সকলেই রাজি হলাম। ফিরতি পথ ধরতেই বুঝতে পারলাম, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। রিমা আতঙ্কিত গলায় বললো, এই জায়গাটা তো একবারেই অচেনা লাগছে। এখন এখান থেকে বের হবো কিভাবে? সামিয়া কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো, আমরা পথ হাঁরিয়ে ফেলেছি। এখন বের হবো কিভাবে?

রিমা আমাদের মধ্যে স্বভাবগত বুদ্ধিমান মেয়ে। সে নিজে যদিও ভয় পেয়েছে, তারপরও বুঝলো যে, এই মুহুর্তে কারো একজন সাহসী হতে হবে। তাই সাহসীর দায়িত্বটা রিমা একাই পালন করছে।

আমার মুখ ভয়ে লাল হয়ে গেল। রিমা বললো, এক কাজ করি সবাই। আমরা যে কোনো একদিকে হাঁটা দেই। হয়তো বের হওয়ার পথ পেয়ে যাব প্রস্তাবটাতে সবাই রাজি হলাম। নিশ্চুপ হয়ে হাঁটতে লাগলাম আমরা। হাঁটতে হাঁটতে রাতের আঁধার নেমে এলো। আশেপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেদিকেই তাকাই শুধুই অন্ধকার। একটু পর পরই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। একটা যেন ভৌতিক পরিবেশ।

সামিয়া একটা গাছের গোড়ায় বসে কাঁদতে লাগলো। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। রিমা চুপচাপ বসে আছে। আয়েশা তো কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছে। আমার মনে হতে লাগলো, এখানেই হয়তো আমরা মারা যাবো।

আমাদের কি তাহলে আর বৃত্তি পরীক্ষা দেয়া হবে না? আমাদের মা-বাবারা হয়তো এতক্ষণে খোঁজাখুজি শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎ আমি দেখতে পেলাম, দূরে একটা আমগাছের ফাঁক দিয়ে কে যেন উঁকি দিচ্ছে। “ওখানে কে, ওখানে কে” বলে আমি চিৎকার করে উঠলাম। রিমা তাকিয়ে দেখলো, কেউই নেই। বললো, কেউই তো নেই।

আামি তাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম, সেখানে মানুষের মতো কেউ একজন ছিল। নাহ্, তারা কেউই আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আমিও আর তাদেরকে জোর করি নি।

হঠাৎ করে জবা ফুলের ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসলো। আশেপাশে যেন নতুন ফুল ফুঁটেছে। সেগুলোই সৌরভ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে। কিন্তু এই ঘ্রাণে কি যেন একটা আছে। আমার চোখ মুঁদে আসলো। চোখের দুই পাঁপড়ি একত্রিত হওয়ার আগে চাঁদের আবছা আলোয় দেখলাম রিমা, আয়েশা এবং সামিয়াও মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তাদের ও যেন চোখ মুদে আসছে।

আমার মনে হলো, মৃত্যু যেন আমাদের আলিঙ্গন করে নিচ্ছে। কিন্তু মৃত্যু কি ঘুমের মতো এতটাই সহজ? ভাবনাটা আর শেষ করতে পারলাম না। দু চোখের পাঁপড়ি মিলে গেল। এক অতেচনতার দুনিয়ায় হাঁরিয়ে গেলাম আমরা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া