নীড়ে ফেরা - আহসানা ইসলাম তাজিয়া

 

নবীন দীপ্ত

ছোটবেলা থেকেই বেশ রাগী ছিলাম আমি। অন্যদের থেকে একটু বেশি ঝগড়াটেও ছিলাম আমি। যে কোনো সময় দুষ্টমি, হাসি-ঠাট্টা, খেলাধূলা ছিল আমার নিত্যদিনকার কাজ। ক্লাসে ভালো ছাত্রীও ছিলাম আমি। ক্লাস থ্রিতে থাকা অবস্থাতেই আমি যথেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষা পেয়েছিলাম পরিবারের নিকট হতে। বাবা-মা ধার্মিক হওয়ায় কখনো কোনো মারাত্বক অপরাধে জড়াই নি তখন। বাবা হাত ধরে ধরে ইসলামের নানান বিষয় শিক্ষা দিতেন। আমার বাবা-মা উভয়ই কুরআনে হাফেজ। ছোটবেলা থেকেই বাবা নামক বটবৃক্ষে নিজেকে সঁপে দেয়ার মধ্যে বেশ আনন্দ অনুভব করতাম আমি।

বাবা কর্ম ব্যস্ততার কারণে প্রায় সময়ই গ্রামের বাহিরে বা জেলার বাহিরে থাকতেন। কাছে পেয়েছিলাম খুব কম। কিন্তু মা-ভাইয়া এবং আপু বাবার অনুপস্থিতিটা বুঝতে দেয় নি। বাবাকে খুব মনে মনে পড়তো। আমি রাগলে তিনি আমার রাগ ভাঙ্গাতেন। হাজারো-বায়না ধরতাম তার নিকট। এভাবেই আমার জীবনের চাকা ঘুরতে থাকে। অন্য দশটি মেয়ের মতো আমিও স্কুলে যেতাম। আমার নাম তাজিয়া। কিন্তু ক্লাসের অন্যরা আমাকে ব্যঙ্গ করে “তাজিয়া মিছিল” বলে ডাকতো। কারো নাম বিকৃতি করে ডাকাটা অনেক বড় অন্যায়। আল্লাহ সূরা হুজরাতের ১১ নং আয়াতে বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা কাউকে নিয়ে উপহাস করো না। আর কাউকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ।”

আমি সহপাঠিদের সাথে বেশি রাগারাগি করায় কেউ আমার সাথে তেমন মিশতে চাইতো না। একদিনকার ঘটনাসহপাঠীদের সাথে খেলার সময় একটা ছেলে আমার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। আমি তখন রাগে তাকে প্রচণ্ড জোরে থাপ্পর মারি। সে কখনো ভাবে নি, আমি তার সাথে এমন করবো। এখন এসব মনে পড়লে আমার আফসোস লাগে। কেন যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না।

স্কুলের জীবনটা খুব তাড়াতাড়িই কেঁটে গেল। এবার আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। জীবনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি আমি। আমারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর ছোটবেলার মতো রাগ নেই। তবে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি ভিন্ন এক পৃথিবীতে। কলেজ লাইফে আসার পর নিজেকে অনেকটাই স্বাধীন ভাবতে লাগলাম। প্রচলিত আধুনিকতার ঢেউয়ের সাথে ভেসে গিয়ে অন্যদের মতো পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করা শুরু

করলাম। ছেলে বন্ধুদের সাথে চলাফেরা, নিজেকে স্মার্ট বলে পরিচয় দেয়ার মধ্যে শান্তি অনুভব করতাম। চোখের সামনে কতজনকে দেখেছি, এই আধুনিকতার ছোঁয়ায় গা ভাসিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। একটা সময় নিজের অপরাধ বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, আমি যে কতটা ভুলের মধ্যে আছি। আমি কুরআন খুলে দেখতে পাই সূরা আরাফের ২৬ নং আয়াতটি। আল্লাহ বলেন, ‘হে বনি আদম! আমি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার ও বেশভূষার জন্য তোমাদের পোশাক পরিচ্ছদের উপকরণ অবতীর্ণ করেছি(বেশ-ভূষার তুলনায়)  আল্লাহ ভীতির পরিচ্ছদই হচ্ছে সর্বোত্তম পরিচ্ছদ। এটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম নিদর্শন, সম্ভবত মানুষ এটা থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে।’

আরো মনে পড়লো নবীজির এই হাদীসটি। “হজরত আলী ও ফাতেমা রা: উভয়ে একদা রাসূল সা:-এর কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে রাসূল সা:-কে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখতে পেলেন। ক্রন্দন তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করল। অতঃপর হজরত আলী রা: রাসূল-এর কাছে কান্নার কারণ জানতে চাইলে রাসূল সা: বললেন : মি’রাজের রাতে আমি উম্মতের নারীদেরকে জাহান্নামে বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর ও কঠিন আজাবে লিপ্ত দেখেছি যা স্মরণ করে আমি কাঁদছি। মহানবী সা: নারী জাতির শাস্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি জাহান্নামে একজন মহিলাকে তার মাথার চুল দ্বারা ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম ওই সময় তার মাথার মগজ ফুটন্ত পানির ন্যায় টগবগ করে ফুটছিল। আরেকজন মহিলাকে স্বীয় স্তনে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম অর্থাৎ সমস্ত শরীরের ওজন স্তনের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

নবী কন্যা ফাতিমা রা: এ শাস্তির কারণ জানতে চেয়ে আরজ করলেন আব্বাজান! মহিলাদের এই ভয়াবহ শাস্তি ভোগের কারণ কি ?

উত্তরে মহানবী সা: এরশাদ করলেন : ‘নারীর শাস্তির প্রথম কারণ : যে মহিলা স্বীয় মাথার চুল দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় সাজা ভোগ করতে দেখেছিলাম তার এই শাস্তির কারণ হলো, সে চলার পথে পরপুরুষ থেকে নিজের চুলকে ঢেকে রাখত না। নগ্ন মাথায় পর পুরুষকে দেখানোর জন্য চুল ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মহিলাদেরকে মাথা ঘাড় ও বুক মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। অবৈধ সম্পর্ক হচ্ছে নারী শাস্তির তৃতীয় কারণ। মহানবী সা: যে মহিলাকে স্তনে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন তার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন : ওই নারী ছিল বিবাহিতা, সে বিবাহিতা হওয়া সত্ত্বেও তার সম্পর্ক ছিল পরপুরুষের সাথে।”

আমি খুঁজে পেলাম নিজেকে। বুঝতে পারলাম, আমার স্রষ্টা তো আমাকে এমনি এমনি সৃষ্টি করেন নি। তিনি আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আমার আল্লাহর আদেশ মানতে হবে। আমার যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবে চলাফেরা করা যাবে না। মনে পড়লো কুরআনের সেই আয়াতটি। মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। যারা মন্দ কাজ করে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ” (সূরা আনকাবুত ২-৪)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া