ফলাফল - ফাতেমা উম্মে হাবিবা
ফাহিম বললো ,
মা আর এক সপ্তাহ পর আমাদের পরীক্ষার
রেজাল্ট বের হবে। মা আফরিন আক্তার বললেন, যদি তোমার রেজাল্ট ভালো হয় তাহলে তোমাকে একটা সাইকেল কিনে দিবো। ফাহিম খুশিতে
লাফিয়ে উঠলো। খুশিতে ফাহিম তার রুমে গিয়ে দরজা আঁটকে দিয়ে উত্তেজনায় লাফাতে থাকে।
একসপ্তাহ পরের
কথা। আজ ফাহিমের পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে । ফাহিমের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে
ছাত্র-ছাত্রী পয়তাল্লিশ জন। ফাহিম এর মধ্যে একচল্লিশতম স্থান অর্জন করেছে। একবার
যদি মা জেনে যায় তবে যে কি হবে! আর বাবা জানলে ...! কথাটা মনে হতেই ফাহিমের বুক
কেঁপে উঠলো। ফাহিম তার বইয়ের আলমারি খুলে একটি বই বের করে। বইটার নাম, জলে ডাঙ্গায়। ফাহিম বইটি খুলে পড়তে লাগলো।
প্রায় দশ মিনিট পর রুমের দরজায় কে যেন টোকা দিলো। ফাহিমের বুক দুরুদুরু করতে
লাগলো। তাড়াতাড়ি করে বইটা আলমারির মধ্যে রেখে দরজা খুলে দেখে তার মা আফরিন আক্তার
দাঁড়িয়ে আছেন। ফাহিম বললো, কিছু
বলবে মা? তার মা বললেন,
তুই দরজা আঁটকে রেখেছিলি কেন? ফাহিম ভয়ে ভয়ে বললো, এমনিই আঁটকে রেখেছিলাম। আফরিন আক্তার বললেন, আচ্ছা তাই! এখন তাহলে ভাত খেতে আয়। ফাহিম
আস্তে আস্তে খাবার টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করলো। পরেরদিন ফাহিম স্কুলে যাওয়ার আগেই
হেডস্যার রাকিবুল ইসলাম ফাহিমের বাবার নিকট ফোন দিলেন। তারপর কি যেন বললেন স্যার।
ফাহিম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে বাবা?
ফাহিমের বাবা
শফিকুল ইসলাম বললেন, আমাকে আর
তোর মাকে হেডস্যার স্কুলে যেতে বলেছেন। এটা শুনে ফাহিমের বুক দুরুদুরু করতে লাগলো।
স্কুলে উপস্থিত হলো ফাহিম। ফাহিমের মা-বাবাও সাথে এলো। হেডস্যার তার মা-বাবাকে
জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ছেলের
কি হয়েছে বলুন তো? ফাহিমের
বাবা বললেন, আমার ছেলের আবার
কি হলো?
হেডস্যার রেগে
গিয়ে বললেন, আপনার সন্তানের
খবর কি আপনারা রাখেন না? ফাহিমের
মা-বাবা দুজনেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারা কি বলবে বুঝতে পারছিলো না। হেডস্যার গম্ভীর
হয়ে বললেন, যেই ছেলে আগে
ক্লাসে এক
নাম্বার ছিল,
সে এবার একচল্লিশ হয়েছে। ফাহিমের
বাবা-মা দু’জনেই যেন আকাশ থেকে পড়লেন! ফাহিমের বাবা বললো, স্যার! আপনি কি সিরিয়াস! সে তো দিন-রাত এক করে পড়তো, তাহলে সে একচল্লিশ হলো কিভাবে? স্যার পিয়নকে ডেকে বললেন, পঞ্চম শ্রেণীর ফাহিমকে ডাক । কিছুক্ষণ পর
পিয়ন ফিরে এসে বললো, স্যার
ফাহিম মাঠে খেলছে। প্রিন্সিপাল স্যার তখন রাগান্নিত কণ্ঠ বললেন, ”এই হলো আপনার ছেলের অবস্থা। ক্লাসের ফাস্টবয়
এখন লাস্টবয় হতে চলছে”। ফাহিমের মা-বাবা হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে তার বাবা
ফাহিমকে নিয়ে বাসায় এলেন। আর মা আফরিন আক্তার কিছু জিনিস কিনতে দোকানে গেলেন।
সন্ধ্যার পর
ফাহিমের বাবা ফাহিমকে বললেন, তোমার
এ বছর আর স্কুলে পড়া লাগবে না। এখন আমি আর তোমার আম্মু তোমার স্যার এবং ম্যাডাম।
ফাহিম তখন বললো, তাহলে কি আমি
আর স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলতে পারবো না? তার বাবা বললেন, পারবে। তবে বিকালে। এ ছাড়া নয়। পরদিন সকাল থেকে
ফাহিমের বাসায় পড়াশোনা শুরু হলো । যেহেতু শফীক সাহেবের অফিস সকাল ১০ টায় । তাই
তিনি তাকে ৮ টা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পড়ালেন। এরপর সে তার মায়ের কাছে পড়া শুরু
করলো। সম্পূর্ন স্কুলের নিয়মেই তাকে পড়ানো হলো। শফীক সাহেব নিয়মিত হেডস্যারের সাথে
যোগাযোগ রাখতেন। তিনি বলে দিতেন, অমুকদিন ওটা পড়াবেন। এভাবে প্রায় পাঁচ মাস চলে গেল । ফাহিম আবার আগের মত আগের
অবস্থানে ফিরে গেল। তার মা তাকে বললেন, এখন কি তুমি স্কুলে যাবে নাকি এখনো বাসায় পড়বে? সে বললো , স্কুলে যাবো। শফীক সাহেব তাকে নিয়ে আবার স্কুলে ভর্তি করালেন। কিছুদিন পরই
বার্ষিক পরীক্ষা।
আজকে বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। ফাহিম স্কুলে যাওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিলো। সাথে আয়াতুল কুরসী এবং দুরুদ শরীফ পড়ে নিলো। সে দুরুদুরু বুক নিয়ে স্কুলে গেল। স্কুলের মাঠে অনেক বড় প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে । আজকে সবার অভিভাবক আসবে। ফাহিমের বাবা একটু পর আসবে। সে এসে প্যান্ডেলের এককোণে বসে পড়লো। তার বন্ধু আহমাদ এসে বললো, এই ফাহিম, আয়! আমরা ফুটবল খেলবো। ফাহিম যেতে অসম্মতি জানালো। সকাল সাড়ে এগারোটা। হেডস্যার বড় একটি শীট নিয়ে মঞ্চে উঠলেন। আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। একে একে প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত , সকলের রেজাল্ট ঘোষণা হলো। এবার পঞ্চম শ্রেণীর পালা। পঞ্চম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়েছে হাবিব। দ্বিতীয় হয়েছে আহমাদ। আর প্রথমস্থান অধিকার করেছে ফাহিম। সেই সাথে ফাহিম স্কুলের সবার থেকে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছে। তার প্রাপ্ত নম্বর ৭০০ নম্বরে ৬৯৯। আর হেডস্যারের পক্ষ থেকে তার চেষ্টার কারণে এক নম্বর গিফট। তাই তার প্রাপ্ত নাম্বার ৭০০ এর মধ্যে ৭০০। স্কুলের সবাই খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো। ফাহিম আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করলো । কারণ তিনিই তো তাকে প্রথম স্থানের অধিকারী করিয়েছেন। তার মনে পড়লো সেই হাদীসটি , চেষ্টা আমাদের আর সফলতার মালিক আল্লাহ তা’আলা।
শিক্ষার্থী; চতুর্থ শ্রেণী, মারকাযুল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন