যোগ্য উস্তাদের শাসন - শারমিন আক্তার
শেখ সাদী রহ. একবার এক জায়গায় সফরে গেলেন। তিনি বর্ণনা করেন,
আমি পৃথিবীর পশ্চিমে এক ফুরকানিয়া মাদ্রাসার জনৈক উস্তাদকে
দেখতে পেলাম। তার চেহারা ছিল খুবই কদাকার। তিনি ছিলেন কর্কষভাষী, বদমেজাজী ও
নিষ্ঠুর প্রকৃতির। ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকরা তাকে দেখতে পারতো না। তিনি
ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য অনেক শাসন করতেন। তার সামনে কেউ হাসাহাসি করতে
পারতো না এবং সন্তুষ্টিচিত্তে কথাও বলতে পারতো না। লোকটি এমনই বদমেজাজি ছিল যে, মাঝে
মাঝে সে সহজ-সরল অবুঝ বাচ্চাদের মারা শুরু করতো। আবার কখনো কখনো তাদের এক পাঁয়ের
উপর দাঁড় করিয়ে রাখতো। ছেলেদের পায়ে উক্ত শিক্ষক শেকল বেঁধেও রাখতো।
শেখ সাদী রহ. বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি, তার অত্যাচারের কথা লোকমুখে প্রচারিত হয়ে তাকে উক্ত
প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়। উক্ত শিক্ষক চলে যাওয়ার পর তার স্থানে একজন সরল, ভালো, দয়ালু শিক্ষককে
নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল। তার কথার মাধুর্যতা দেখে শিক্ষিতরাও
লজ্জায় মুখ লুকাতো। প্রয়োজন ব্যতিত তিনি কোনো কথা বলতেন না। লোকেরা যেন তার দ্বারা
কোনো কষ্ট না পায়, সেদিকে
থাকতো তার সজাগ দৃষ্টি।
তার ব্যবহারে ছাত্র কিংবা ছাত্রীদের অন্তর থেকে পূর্বের
শিক্ষকের ভয় দূরিভূত হয়ে গেল। তারা যেন নতুন জীবন ফিরে পেল। দ্বিতীয় শিক্ষককে
তাদের কাছে মনে হতে লাগলো,
আসমান থেকে নেমে আসা ফেরশতা। ছাত্র-ছাত্রীরা এই সুযোগ পেয়ে উক্ত শিক্ষকের সরলতার
আশ্রয় নিতে লাগলো্ তারা একেকজন যেন দৈত্যের ন্যায় আচরণ করতে লাগলো। আস্তে
আস্তে প্রত্যেকেই ভালো ছাত্র থেকে খারাপ ছাত্রে পরিণত হতে লাগলো। তারা পড়ালেখা যে
কিভাবে করতে হয়, সেটাই
ভুলে গেল। তারা সারাদিন খেলাধূলা আর মারামারিতে
লিপ্ত থাকতো। এভাবেই কয়েক সপ্তাহ অতিবাহিত হলো।
এরপর আমি সপ্তাহ খানেক পর আবার উক্ত মাদ্রাসার সামনে দিয়ে
যাচ্ছিলাম, দেখি
প্রথম শিক্ষক আবার ফিরে এসেছেন। তিনি খুব হাসি-খুশি অবস্থায় আছেন। দ্বিতীয়
শিক্ষককে বিদায় দিয়ে আবার তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
কেন যেন, আমার এতে খুব কষ্ট লাগলো। আমি ভাবতে লাগলাম, এই লোক আবার ফিরে
এলো কেন? আর
দ্বিতীয় শিক্ষককে বিদায় করা হলোই বা কেন? আমার পাশ দিয়ে যাওয়া একজন স্থানীয় বৃদ্ধকে প্রশ্নটি
করলাম। তিনি প্রশ্ন শুনে হেসে দিলেন। আর বললেন,
একজন রাজা তার ছেলেকে এই মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন। তিনি তার
ছেলের স্লেটের একপাশে রৌপ্য দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন, উস্তাদের শাসন পিতা-মাতার স্নেহ থেকে অনেক
উত্তম।
উপদেশ; যোগ্য উস্তাদ যদি শাসন না করে তাহলে ছাত্র-ছাত্রীরা
বাহ্যিকভাবে মানুষ হবে। আভ্যন্তরীনভাবে তারা হবে এক একটা পশু।
শারমিন আক্তার
শিক্ষিকা, মারকাযুল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন