মহিয়সী মা - আল আমিন রায়হান

 
মা, পৃথিবীর অন্যতম এক সত্ত্বা। হাজার দুঃখ কষ্ট সন্তানের ইচ্ছেপূরণের ক্ষেত্রে মাকে বাধা দিতে সক্ষম নয়। যার ভালোবাসা শত ঝড়েও সামান্যতম ত্রুটি হয় না নিজ সন্তানকে গড়ে তোলার জন্য। যিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও পরোয়া করেন না সন্তানের জন্য। পৃথিবীর সকল প্রাণ, স্বার্থ নামক তরীর কাছে হার শিকার করতে বাধ্য হয়। স্বার্থ ব্যর্থ মানে সম্পর্ক ব্যর্থ। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পর মা হলো সন্তানের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। তিনি হাজারো বিপদ-আপদে সন্তানকে সঙ্গ দেন। ইচ্ছেপূরণে ক্ষেত্রে তিনি সন্তানের বন্ধুর পরিচয় দেন।

পৃথিবীর সকল মায়েরা কেমন তা আমার ধারণার বাহিরে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে একজন মহিয়সী মা উপহার দিয়েছেন। যিনি আমার পৃথিবীর একমাত্র স্বপ্ন। যাকে ঘিরে আমার প্রাণ। যিনি ভালোবাসা এবং স্নেহ-মমতা দিয়ে আমাকে লালন-পালন করেছেন। পৃথিবীর সকল মায়েরাই সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে শ্রেষ্ঠ উপহার। আর আমার মা আমার জন্য তেমনই শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। ব্যর্থতার এই পৃথিবীতে তিনি আমাকে কখনো একা ছাড়েন নি। আমাকে তিনি সঙ্গ দিতে ভুলেন নি।

আমি বাবা হারিয়েছি তের বছরের উর্ধ্বে। কিন্তু কখনো নিজেকে একা ভাবার সুযোগ হয় নি। বাবা হারানোর বিরহ-বেদনা মায়ের আদর-যত্ন দ্বারা পূর্ণ হয়েছে। যে কোনো কাজে মা থেমে যেতে রাজী নন। তিনি শত প্রতিকূলতার মাঝেও অভিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যেতেন। গত দশ বছরের শিক্ষা জীবনে আমাকে কখনো অভাব-অনটন বুঝতে দেন নি। আমার অসুস্থতার খবর পেলে তিনি নিজেকে পাগল করে তুলতেন। এই তো বছরখানেক আগের কথা।

দুর্ঘটনায় আমার ডান হাত ও ডান পায়ের হাড্ডি ভেঙ্গে যায়। এহেন কঠিন মূহুর্তেও মাকে পেয়েছি জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হিসেবে। সেবা-শুশ্রূষায় কোনো কমতি দেখান নি এই নারী। যখনই মন খারাপ করে বসে থাকতাম তখন মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বলতেন, বিপদ যেই আল্লাহ দিয়েছেন বিপদ থেকে সেই আল্লাহই উদ্ধার করবেন।  অনেক রাত এমনভাবে অতিবাহিত হয়েছে যে, সারারাতে মা বিছানার সাথে পিঠ লাগান নি।

সন্তানদের আদর-যত্ন দিয়ে বাবা হারানোর বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছেন তিনি। বড় হওয়ার পরও তিনি সেই ছোটবেলার মতো এখনো আদর-যত্ন করেন। তার কাছে আমি বড় নই। আমি সেই ছোট্ট খোকাটিই রয়ে গেছি।

আমরা দুই ভাই ও বড় বোন, এই তিনজনকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। সর্বদা তিনি আমাদের নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন জীবনের খারাপ সময়গুলো কিভাবে কাঁটিয়ে উঠতে হয়। শিখিয়েছেন কিভাবে মানুষের উপকার করতে হয়। শত্রুদের সাথেও কিভাবে হাসিমুখে কথা বলতে হয়, সেটাও আমরা তার থেকে শিখেছি।

যখন আমি ২য় শ্রেণীতে পড়ি তখন আপু মহিলা মাদ্রাসায় পড়তো। আমাদের মাদ্রাসার সামনে দিয়েই সে আসা-যাওয়া করতো। আমার অন্যান্য সহপাঠীদের ভাগ্য যেমনই হোক কিন্তু আমার জন্য প্রতিদিন বিকেলে জুঁটে যেত আট আনার চকলেট আর কচকচে পাঁচ টাকা। কখনো কখনো জুঁটতো দুই টাকার চকচকে নোট।

৫ম শ্রেণীতে পড়ার সময় ভাইয়া প্রথম কাজ-কর্ম করা শুরু করে। প্রথম মাসের বেতনে সর্বাদিক আনন্দিত হয়েছিলাম আমি। আগে এমন দামী জামা ভাগ্যে জুটে নি, যেটা ভাইয়া আমাকে কিনে দিয়েছিল। ভাইয়া মাঝে মাঝে আমাকে শাসন করতেন। কিন্তু পরক্ষণেই আনন্দ আর সোহাগমাখা আদর দিয়ে দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন।

মা মাঝেমধ্যে আমাদের এমন কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতেন। আবার কখনো ভাবনায় পড়ে যেতেন। মা রাতের বেলায় আমাকে বলতো, তোরা মিল-মুহাব্বাত করে থাকবি তো সারাজীবন?

আমি বলতাম, কোনো চিন্তা করো না তুমি। প্রয়োজনে ভাইয়া শাসন করার সময় আমি চুপ করে থাকবো। তখন মা কপালে চুমু দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন।

অনেক সময় মা রাতে আমাকে গল্প বলতেন। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া সেসব গল্প। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন। খুব কষ্ট হতো আমার। বলতাম, কেঁদো না মা। আমরা বড় হলে তোমার সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

যখন ঈদের সময় বা কোনো আনন্দঘন মুহুর্তে আমরা একসাথে আনন্দে মেতে উঠতাম তখন বুঝাই যেত না আমাদের ঘরে অভাব বলে কিছু বাস করে। আমাদের সকল আনন্দ-উল্লাসে আম্মু থাকতেন সর্বাগ্রে। আমার মায়ের সেই উপদেশ আমাকে আজো ইলমের পথে অবিচল রেখেছে। আমাকে এখনো সকল কিছু্র উপর নিজের দ্বীনকে প্রাধান্য দেয়া শিখিয়েছে। মা বলতেন, সর্বদা ইসলামের পথে চলবা বাবা। কখনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হবা না।

পৃথিবীর সকল সন্তানকে আল্লাহ আমার মায়ের মতো মহিয়সী মা দান করুন। আর আমাদের মাঝে আমার মাকে যেন আল্লাহ দীর্ঘজীবী করেন সেই প্রার্থনা করি। আমাদের আমাদের সকল মায়েদের নেক-হায়াত ও সিহহাতে আফিয়াত দান করুন। আমীন।


 আল আমিন রায়হান

শিক্ষার্থী; মেশকাত জামাত, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম দিলুরোড মাদ্রাসা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া