জীবনের প্রথম ব্যবসা - মাসরুর ইহসান

 

মানুষের জীবনে প্রথমবার ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা বা প্রথমবার সম্পাদিত অনেক কাজ আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকে আমার জীবনেও এমন কিছু স্মরণীয় ঘটনা আছে যা আমাকে স্মৃতিকাতর করে তোলেএসব ঘটনার মধ্যে যেমন আছে আনন্দ-বেদনার স্মৃতি তেমনই আছে রোমাঞ্চকর কিছু স্মৃতি যখন আমি কলম ধরলাম তখন আমার জীবনের প্রথম দিকে ঘটে যাওয়া অসংখ্য স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে জীবনের প্রথম লেখা, প্রথম বক্তৃতা, প্রথম ভূত দেখা, প্রথম চশমা পড়া, প্রথম দেশে সফর করা, প্রথম বিদেশে সফর করা, প্রথম ছিনকাইকারীর কবলে পড়া, পরিবারের প্রথম কারো মৃত্যুসহ আরো অনেক আনন্দ-বেদনার স্মৃতি আমার মাথায় কিলবিল করছে কিন্তু সবকিছু তো এখন লেখা সম্ভব নয় আবার অনেক কিছু বর্ণনা করা সম্ভবও নয় তাই ভাবছি, বাছাইকৃত কিছু ঘটনা আজকে উল্লেখ করবো

প্রথম ব্যবসা

আমার জীবনের প্রথম ব্যবসা হলো বন্ধুদের সাথে মিলে ভাতের ব্যবসা এটি ২০১৩ সালের ঘটনা তখন আমি বাড্ডায় থাকতাম মাদরাসার ছোট-বড় সবার সাথেই

আমার খাতির ছিল বড় ভাইদের মধ্যে একজন ছিলেন পাক্কা বাবুর্চি তার রান্নার বেশ সুনাম ছিল পড়ালেখা করা অবস্থাতেই তিনি বড় বড় অনুষ্ঠানে খাবার পাকানোর

কন্ট্রাক্ট নিতেন বড় ভাই স্থানীয় হওয়াতে আমরা সবাই তাকে বেশ সমীহ করে চলতাম।সেই বছর বিশ্ব ইজতিমার শুরুর কয়েকদিন আগে বড় ভাই আমাদের ডেকে প্রস্তাব দিলেন,‘চলো! ইজতিমা উপলক্ষে আমরা একটি ব্যবসা হাতে নেই।এতে ভালোই লাভ হবে।তার প্রস্তাবে আমরা সবাই রাজী হয়ে গেলাম যেহেতু বড়ভাই নামকরা বাবুর্চি এবং এ ব্যাপারে তার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই ব্যবসা যে ভালো হবে এতে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না

এখন ব্যবসার পুঁজি কীভাবে সংগ্রহ করবো এ নিয়ে আমরা পরামর্শে বসলাম পরামর্শে সিদ্ধান্ত হলো, আমরা আটজন বন্ধু প্রত্যেকেই পাঁচ হাজার টাকা করে জমা দিবো আর ঐ বড়ভাই কোনো টাকা দিবেন না তিনি তার বাড়ি থেকে হোটেলের জন্য হাড়ি-পাতিল, থালা-বাটি সরবরাহ করবেন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে গেল সবাই নিজের ভাগের টাকা জমা দেয়া শুরু করেছে উল্লেখ্য যে, আমরা আটজনই তখন ছাত্র এবং এরমধ্যে পাঁচজনের বয়স বিশের নিচে আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর বলে রাখি, আমার ছোটবেলা থেকেই টাকা জমানোর শখ ছিল তাই তখন তখন আমার নিকট পাঁচহাজার টাকা জমানো ছিল আর বাসার কেউও এটা জানতো না আমরা ইজতিমা ময়দানের পাশে তিনদিনের জন্য জায়গা ভাড়া  নিলাম। নিজেরাই রাত-দিন পরিশ্রম করে বাড্ডা থেকে টিন ভাড়া করে হোটেলের ঘর নির্মাণ করলাম জায়গাটার জন্য অগ্রিম অস্বাভাবিক ভাড়া পরিশোধ করার পরও, কাজ শুরু করার আগে বাধা দেয় স্থানীয় মাস্তানরা মাস্তানদের চাঁদা দিয়ে হোটেল শুরু করলাম হোটেল শুরু করার পর পড়লাম আরেক নতুন ঝামেলায় একেরপর এক মাস্তানদের গ্রুপ আসতে থাকলো সকালে এক গ্রুপ আসে তো বিকালে আরেক গ্রুপ আসে, রাতে আবার নতুন গ্রুপ অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, এটা এখানকার নিত্যদিনকার ব্যাপার সবারই মন খারাপ, ব্যবসায় লাভ তো দূরের কথা, বরঞ্চ পুঁজির

অংশটাও মাস্তানদের হাতে তুলে দিতে হবে তাই একটা শঙ্কায় পড়ে গেলামচাঁদাবাজির ক্ষতি

পুষিয়ে নিতে আমরাও অন্যান্য হোটেলের মতো খানার দাম বাড়িয়ে দিলাম বেচা-কেনা ভালোই হচ্ছিলো আমরা নিজেরাই বাবুর্চি আবার নিজেরাই ওয়েটার, নিজেরাই ক্লিনার, নিজেরাই ম্যানেজার সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং কঠিন কাজ ছিল, নোংরা থালা-বাটি পরিষ্কার করা এই কাজটি কেউই করতে চাইতো না আমি ছোট ছিলাম বিধায় বেশিরভাগ সময় আমারই ঐসব পরিষ্কার করতে হতো যে পরিমাণ খাবার বিক্রি হয়েছে, সে পরিমাণ টাকা ক্যাশ হয়নিদ্বিতীয়দিন ক্যাশে আরো বেশি গোলমাল ধরা পড়লো তৃতীয়দিন বড়ভাইয়ের মেজাজ সকাল থেকেই খারাপসবার সাথেই খারাপ ব্যবহার করছেন নানান অজুহাতে সবাইকে খামোখাই ধমকাচ্ছেন। প্রতিদিনের বিক্রির টাকা একটা ছোট ব্যাগে সংরক্ষণ করা হতো ক্যাশের দায়িত্বে যে ছিল, ব্যাগটা তার হেফাজতেই থাকতো দুপুরের দিকে বড়ভাইয়ের মেজাজ চরমে পৌছে গেল তিনি সবজি কাঁটার বটি ধরে ক্যাশের ব্যাগটা হাতিয়ে নিলেন এবং হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, যে সামনে আসবি তার পেট ফেঁড়ে ফেলমু তার রুদ্রমূর্তি দেখে সবাই হতভম্ব তিনি একহাতে টাকার ব্যাগ আর আরেকহাতে বটি নিয়ে গালি দিতে দিতে চলে গেলেন ভয়ে-আতঙ্কে কেউই তার সামনে গেলাম না ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লাম চরম হতাশা আর ক্ষোভে সবাই দিশেহারা হয়ে পড়লো

হোটেল ব্যবসার নিয়ম হলো, কোনো আইটেম শেষ না হলেই লস আমাদের টার্গেট ছিল, শেষ দিন সবগুলো আইটেম বিক্রি হয়ে যাবে কিন্তু শেষ দিনটা হলো সবচেয়ে বাজে একটা দিন হোটেলের বেচা-কেনা বাদ দিয়ে সবার একদিকে যেমন টাকার চিন্তা আরেকদিকে বড়ভাই টাকা নিয়ে কোথায় গেলেন, সেই চিন্তা।

অবশেষে অনেক খোঁজাখুজি করে তাকে পাওয়া গেল আমার অনেক অনুরোধে বড়ভাই বিকালে ফিরে আসলেন সবার মাঝে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হলো যাই হোক, টঙ্গী থেকে ঢাকায় ফিরে এসে একদিন বিশ্রাম করে আমরা ব্যবসার হিসাব নিয়ে বসলাম হিসাব-নিকাশ করে প্রত্যেকে তিন হাজার টাকা করে পেলাম মানে পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে,পাঁচদিন অমানুষিক খাটুনির বিনিময়ে দুই হাজার টাকা হারিয়ে তিন হাজার টাকা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। তখন মনকে এই বলে সান্তনা দিলাম, ব্যবসা এমনই কখনো লাভ হয় আবার কখনো লস!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া