বৃত্তের বাইরে - মো: ওয়ালিউল হাসান

প্রকৃতিতে এমন একটা সময় আসে,যখন গাছে গাছে নতুন কলি গজায়,ধীরে ধীরে সেগুলোর বয়স বাড়তে থাকে।এরপর এমন একটা সময়ও আসে,যখন পাতার সবুজ আভা চলে যায়।সেখানে ভর করে জীর্ণতা-বিবর্ণতা।পাতা হারায় তার রুপ-সজীবতা।ঝরতে থাকে পাতা।একসময় গাছ এতটাই পাতাশূন্য হয়ে পড়ে,দেখতে ন্যাড়া মাথা যুবতির মত লাগে।গাছের এই রূপ ভাবুক পথিকের মনে জন্ম দেয় গভীর বিষাদের।কিন্তু গাছের এই বিবর্ণতা এই হাহাকার বেশিদিন থাকেনা।একসময় গাছে গাছে আবার কুঁড়ি আসে,নতুন পাতা গজায়।প্রকৃতি সাজে নবরূপে, এতটাই নিখুঁতভাবে,দেখলে মনেই হবেনা,এটা একসময় পাতাশূন্য ছিল।মানুষের জীবনটাও ঠিক এমনই।মানুষের জীবনেও এমন জীর্ণতা-বিবর্ণতা,এমন হাহাকার আর খাঁ-খাঁ শূন্যতা আসে।সে শূন্যতায় হাল না ছেড়ে,শূন্যতাকে পূর্ণতায় বদলে দেয়ার চেষ্টা করাই একজন সত্যিকার বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য।হয়তো সে অসীম শূন্যতা পুরোপুরি

পূর্ণ হবেনা।কিন্তু,কিছুটা তো হবেই...! তাতেই বা মন্দ কি..?প্রচণ্ড পিপাসার্ত ব্যক্তি তো শুভ্র বরফ-শীতল পানি কামনা করেনা,সে চায় পান করার উপযুক্ত একটুখানি জল।তা পেলে সে ভাবে এ তো স্বর্গীয় শরাব।মাঝ সাগরে ডুবন্ত ব্যক্তি তো বিলাসবহুল কোন জাহাজের প্রত্যাশা করেনা।সে চায় বেঁচে থাকার একটুখানি অবলম্বন,হোক তা খড়কুটা।এতটুকু পেলেও সে নিজেকে সফল ভাবতে চায়।সেটা আঁকড়ে ধরেই সে বাঁচতে চায়।


জীবনের অসীম শূন্যতায়ও এমন হলে দোষ কোথায়...? শুধুই হারানোর চাইতে কিছু পাওয়া,হাজারো শূন্যতার মাঝেও কিছুটা প্রাপ্তি,এতে ক্ষতি কি...? যার হারানোর কিছু নেই, সামান্য প্রাপ্তিও তার জন্য হতে পারে অনেক বড়, অনেক বেশী।

প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার হিসাব কিছু মানুষ সারাজীবন করে।এবং প্রাপ্তির তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ করার প্রাণান্তকর প্রয়াসে নির্লিপ্ত থাকে।এর জন্য যা কিছু করা দরকার,সেসব করতেও একটুও পিছপা হয়না।আর কিছু মানুষ শুধু হিসাব করতে করতেই জীবনের অনেক মুল্যবান সময়ের হারিয়ে ফেলে।তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে,  প্রাপ্তির আনন্দলাভে সমর্থ হয়না।কারণ, তারা কিছু অর্জনের জন্য নিয়মিত এবং নিয়মমত শ্রম দিতে উৎসাহী বা উদ্যোগী,কোনটাই হয়না।তাই দিনশেষে তাদের হাত থাকে শূন্য,তাদের হতাশার শ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।হতাশার কারনেই পতনোন্মুখ এইসব লোকদের জীবন মুখ থুবড়ে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়।তাসের ঘরের মতোই হালকা বাতাসে তাদের জীবন ধ্বসে যায়।অসীম শূন্যতার মাঝে এরা হারিয়ে যায় অজানায়।কিন্তু যারা কিছু অর্জনের জন্য লক্ষ্য ধরে এগোয়।জীবন ও প্রকৃতি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে এবং সেই শিক্ষা জীবনে ধারণ করে,তারা হয় সফল,প্রাপ্তির আলোয় উজ্জ্বল। ব্যর্থতার নিকষকালো আঁধারে তাদের অর্জনগুলো ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলতে থাকে।অসীম শূন্যতাকে পূর্ণতায় রূপান্তর করে তাঁরা।।এই যে শিক্ষা,প্রকৃতির ও জীবনের,পৃথিবীর শুরু থেকে আজও পর্যন্ত  আল্লাহ তায়ালা বারবার আমাদেরকে শিখিয়েছেন। সাফল্যের প্রথমসুত্র হলো, ধৈর্য। আমরা ধৈর্যের শিক্ষা পাই কুরআন থেকে, হাদিস থেকে, পূর্ববর্তিদের জীবনী থেকে,প্রকৃতি ও জীবন থেকেও।আমরা ধৈর্যের শিক্ষা পাই হযরত নুহ (আ:) থেকে,একটানা সাড়ে নয়শত বছর লোকদেরকে দ্বীনের পথে ডেকেছেন, আল্লাহর দিকে ডেকেছেন।খুব কম মানুষই সাড়া দিয়েছিল,কিন্তু তিনি হাল ছেড়ে দেননি।ধর্মের বাণী পৌঁছাতে কার্পণ্য করেননি।হযরত আইয়ুব (আ:) ঘটনাও আমরা জানি,হঠাৎ করেই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন,দীর্ঘকাল সেই রোগে ভুগেছেন,কষ্ট সয়েছেন,তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য তার সব সম্পদ কেড়ে নেয়া হয়েছে,তাঁর পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে,তাঁর সম্প্রদায় তাকে ত্যাগ করেছে।কিন্তু এত্তকিছুর পরেও তিনি ধৈর্য হারাননি।প্রতিটি কষ্টের পরে প্রশান্তচিত্তে আল্লাহ তায়া'লার শুকরিয়া আদায় করেছেন।ইউসুফ (আ:) এর ঘটনা কে না জানে?.তাঁর ভাইরা চক্রান্ত করে তাঁকে তাঁর বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।অন্যায়ভাবে তাঁকে দাস বানানো হয়েছিল।অকারণে দীর্ঘসময় জেল খাটতে হয়েছিল।কিন্তু এতসব সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ধরেছেন,আল্লাহ তায়া'লার প্রতি কৃতজ্ঞ থেকেছেন।আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা:)এর এর জীবনের প্রতিটা পরতে পরতে আমরা ধৈর্যের সুমহান শিক্ষা পাই।অন্যায়ভাবে তাঁকে শিয়া'বে আবি তালিবে তিন বছর সবান্ধব অবরুদ্ধ করে রাখা


হয়েছে,কাফেরদের পাথরের আঘাতে তাঁর পুরো শরীর রক্তে ভেসে গেছে,তাদের অত্যাচারে প্রিয় জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন,প্রিয় কন্যা ও চাচা তাদের হাতে শহীদ হয়েছেন।এছাড়াও


বহু ধরনের শারীরিক-মানসিক কষ্ট সইতে হয়েছে।কিন্তু তিনি একটিবারের জন্যও ধৈর্য হারাননি। চাইলে তিনি কঠিন প্রতিশোধ নিতে পারতেন।তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া একটি শব্দই পুরো কাফের সমাজের ধ্বংসের জন্য জন্য যথেষ্ট  ছিল।কিন্তু তিনি তা করেননি,বরং যখন নিজহাতে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পেলেন,তাঁর কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হল,আজ সবাই মুক্ত, সবাইকে মাফ করে দেয়া হল। ফলাফল কি ছিল...? সাথে সাথেই বহু মানুষ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয়

নিল।তাঁদের এই কর্মপন্থার ফলাফল কি খারাপ ছিল...? তাঁদের ধৈর্য কি তাঁদের লক্ষ্যপূরণের পথে বাধা হয়েছিল...?কখনোই নয়।তাঁরা সফল হয়েছিলেন এবং তাঁদের সাফল্যের মাত্রা আর ধরনটা ছিল অন্যরকম মহিমান্বিত।

[২য় পর্ব আগামী সংখ্যায়]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া