ইচ্ছেপূরণ - আব্দুর রহমান আল হাসান
সালমানের বড় ইচ্ছা , সে আলেম হবে। কিন্তু সে তো স্কুলে পড়ে । বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে । তার ইচ্ছা সে আল্লাহকে চিনবে । সে রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করবে । গত তিনদিন আগে তার এলাকায় তাবলীগ জামাতের সাথিরা এসেছিল । কি সুন্দর তাদের চলাফেরা । বড্ড ইচ্ছা করে তাদের সামনে বসে থাকতে । এমন প্রশান্তি সে আগে কখনো অনুভব করে নি । আজকে ফজরের পর যখন তারা চলে যাবে সে তখন তাদের আমীর সাহেবকে বলেছিল , হুজুর , আমি কি কোরআন বুঝতে পারবো ?
উক্ত মাওলানা সাহেব মিষ্টি করে হেসে বলেছিলেন , কেন নয় ? চেষ্টা করো । সফলতার মালিক আল্লাহ ।
তারপর সেই ব্যাক্তিরা চলে গেল । সালমান আবার স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করলো । তার বাবা জামিল সাহেব একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করেন । গত কিছুদিন ধরেই সালমান লক্ষ করছে , তার বাবা আগের মতো নামাজ পড়ে না । নামাজের সময় হরে তিনি কেমন যেন আত্মগোপনে থাকেন । মসজিদে নামাজ শেষ হয়ে গেলে আবার দিব্যি চলাফেরা করেন । বিষয়টা সালমানকে ভাবিয়ে তুলে । কিন্তু কিভাবে সে জানতে পারবে , তার বাবার কি হয়েছে ? বুদ্ধি করে সে তার আম্মুকে বললো , মা আমি তো চাই আল্লাহকে চিনতে এবং রাসূলের আদর্শে জীবন পরিচালনা করতে । মা এই কথা শুনে কটমটিয়ে তাকালেন । রাগান্নিত কণ্ঠে বললেন , ওই রাকাজারদের আদর্শে আদর্শিত হতে চাস ? এসব বাদ দিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা কর । সালমান এই কথা শুনে অবাক হয়ে গেল । জম্মের পর থেকে সে দেখে এসেছে , তার মা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো । কোনো হুজুর দেখলে সালমানকে বলতো , বাবা এদের মতো ভালো মানুষ হবে । সেই মা আজ হুজুরদের রাজাকার বলছে । সে ভাবলো , বাবা-মায়ের গতিবিধি ফলো করা লাগবে । যেই ভাবা সেই কাজ ।
কিছুদিন পর সে দেখলো , তার বাবা-মা পরিপাটি হয়ে কোথায় যেন যায় । সে এ বিষয় জানতে চাইলে তার বাবা বললো , এখন তো তোমার কোথাও যাওয়ার বয়স নয় । তুমি বাসায় বসে পড়াশোনা করো । দুইদিন পরে তো তোমার পরীক্ষা ।তারপর সালমান আর কথা বাড়ালো না । কারণ এখন কথা বাড়ালেই হিতে বিপরীত ঘটতে পারে । সালমানের বাবা-মা চলে গেলেন । সে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না । কাকে তার সমস্যার কথা জানাবে । এসব ভেবেই তার আধ ঘন্টা সময় চলে গেলো । সে ঘরের ভিতর একাকী পায়চারি করতে লাগলো । হঠাৎ তার চোখ গেলো ঘরের কোণে থাকা বুকসেলফের দিকে । অনেকদিন কোনো বই পড়া হয় না । একটা বই পড়া উচিৎ । সেখানে তেমন কোনো ইসলামিক বই নেই । সব গল্পের বই । কিছু সাইন্সের বইও রয়েছে । সাইন্সের বই দেখে তার একটা কথা মনে পড়লো । কিছুদিন পূর্বে ক্লাস নাইনে যখন সায়েন্সের ক্লাস হচ্ছিলো তখন খলীল স্যার বলেছিলেন , বিজ্ঞান আমাদেরকে যা দিয়েছে সৃষ্টিকর্তাও আমাদের এতো কিছু দেয় নি । এ কথা শুনে কয়েকজন বলে উঠেছিলো , স্যার কোরআনে যা আছে বিজ্ঞানে তাই আছে । স্যার তখন হো হো করে হেসে বলেছিলেন , এতটা জ্ঞানী কবে হইলা বাছাধন ! ছাত্ররা আর কেউ তখন বলে নি । স্যার তখন বলেছিলেন , কেউ যদি কোরআনের সত্যতা প্রমাণ করতে পারো , তাহলে পুরষ্কার পাবে ।
সালমান একটি বিজ্ঞান বই বুকসেলফ থেকে নিলো । নামা থিউরী অব রিলেটিভিটি । বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইনিষ্টাইনের বই । তিনি তো একজন ইহুদী ছিলেন । কিন্তু একবার এক আলেমের মুখে সালমান শুনেছিলো , থিউরী অব রিলেটিভিটির অধিকাংশ তথ্যই নাকি কোরআনে আছে । সালমান চেয়েছিলো তাকে জিজ্ঞাসা করতে । কিন্তু তিনি সেদিন এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে , সালমানকে আর সময় দিতে পারেন নি । প্রায় দেড় ঘন্টায় সালমান থিউরি অব রিলেটিভিটি বইটি পড়ে শেষ করলো । যখনই বইটি সালমান বন্ধ করে রাখলো তখনই দূর মিনার থেকে শোনা গেলো আসরের আযান । সালমান তাড়াতাড়ি অজু করে পাঞ্চাবী পড়ে মসজিদে গেলো । মসজিদের ইমাম সাহেব খুবই ভালো মানুষ । তার মতো ভালো মানুষ সালমান এই এলাকায় কমই দেখেছে । নামাজ শেষে সালমান অনেকক্ষণ বসে রইলো । ইমাম সাহেব বিষয়টা লক্ষ করলেন । তিনি জিজ্ঞাসা করলেন , বাবা তুমি খেলুধূলা করো না ? সালমান ভারক্রান্ত হৃদয়ে বললো, হুজুর আমি কোরআন বুঝতে চাই । হাদীস পড়তে চাই । কিন্তু আমার মা-বাবা আমাকে দিচ্ছে না । তারা নামাজ পড়ে না । রোজা রাখে না । আমি তাদেরকে কিছু বললেই তারা বলে , রাজাকারদের অনুসরণ করিস না ।
এ কথা শুনে হুজুর মুচকি হাসলেন । তারপর সালমানকে বললেন, চলো আমরা একটু হাঁটতে বের হই । হাঁটতে হাঁটতে আমাদের কথা হবে । সালমান ইমাম সাহেবের সাথে হাঁটতে বের হলো । গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে লাগলো । দু’পাশে সারি সারি গাছ । মাঝে সাপের মতো আঁকাবাকা রাস্তা । কোনো উঁচু স্থান থেকে দেখলে মনে হয় , এ যেন জান্নাতের এক টুকরো । সালমান মনে করার চেষ্টা করলো , কিছুদিন পূর্বে সে বান্দরবান গিয়েছিলো । তখন পাহাড়ে উঠে যখন সে নিচে তাকাইলো , মনে হলো এ যেন জান্নাতের এক টুকরো । তার মুখ দিয়ে তখন নিজের অজান্তেই একটি শব্দ বের হয়েছিলো , “সুবহানাল্লাহ” । ইমাম সাহেবের ডাকে তার হুশ ফিরলো । হুজুর বললেন , দেখো এই রাস্তা দিয়ে কত মানুষ প্রতি নিয়্যত হেঁটে যায় । এই রাস্তার দু’পাশে এই গাছ-গাছালি যে কাউকে মুগ্ধ করবে । যারাই এ রাস্তা দিয়ে যায় , তারাই কিন্তু কৃতজ্ঞ থাকে রাস্তার দুপাশের জমিগুলোর মালিকদের উপর । কেননা তারাই তো এতো সুন্দরভাবে এই জায়গাটা সাজিয়ে রেখেছে । হয়তো তারা এভাবে সাজিয়ে রেখেছে অন্য কোনো কারণে । কিন্তু এতে যে তারা অজান্তেই অন্য একজন ব্যাক্তিকে খুশি করছে , তাই সে সাওয়াবের অধিকারী হবে । আমাদের নবী মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন , প্রত্যেক ভালো কাজই সাদকা ।
তুমি বলেছিলে তোমার বাবা নামাজ পড়ে না । তোমার মা নামাজ পড়ে না । তারা হুজুরদেরকে রাজাকার বলে । এখন তুমি যদি তাদের সাথে তর্ক করো , তাহলে হিতে বিপরীত ঘটবে । তোমার এখন তাদেরকে বুঝানোর প্রয়োজন নেই । যখন নামাজের সময় হবে , তুমি তোমার আব্বু আম্মুকে বলবে , আম্মু বা আব্বু আমি নামাজ পড়ে আসছি । আর কিছু বলা লাগবে না । তুমি তারপর মসজিদে চলে আসবে ।
সালমান বললো , কিন্তু আম্মু-আব্বু বাসায় থাকলে তো আমাকে মসজিদে আসতে দেয় না । ইমাম সাহেব তখন তাকে বললেন, তুমি আজকে যতুটুকু কষ্ট করছো , এর থেকেও বেশি কষ্ট সাহাবারা করেছিলো । এক কাজ করো , তোমাকে না আসতে দিলে বাসাতেই নামাজ পড়বে । তবে পড়েতে হবে । আর সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া করবে । তিনিই সর্বোত্তম ফায়সালাকারী ।
( ছয় মাস পর )
সালমান তার বাবার হাত ধরে মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছে । ইমাম সাহেব সালমানের বাবাকে হাসিমুখে সালাম দিলেন । সালমানের বাবা ঈমাম সাহেবের সাথে আলিঙ্গন করলেন । আজ ঈদের দিন । চারিদিকে খুশির জোয়ার বইছে । সবাই সবাইকে ঈদ মোবারক জানাচ্ছে । এখন আর সালমানের বাবা নামাজের সময় পালিয়ে বেড়ায় না । আযানের পর পর মসজিদে চলে আসেন । কিভাবে হলো এই পরিবর্তন !? সেই গল্পই এখন আমরা শুনবো ।
যেদিন সালমানকে ইমাম সাহেব বললেন , তুমি যেখানেই থাকো আর যেভাবেই থাক ,নামাজ পড়ে ফেলবে । সে এই কথাটার উপর পূ্র্ণভাবে আমল করে একদিন সকালে সালমান ফজরের সময় উঠে নামাজ পড়ে । তখন সালমানের বাবা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ।তিনি স্বপ্ন দেখছেন , বিশাল বড় একটি মরুভূমি । চারিদিকে ধূ ধূ মরু প্রান্তর । তিনি খুবই পিপাসায় কাতর । কিন্তু এই বিস্মৃত মরুভূমিতে পানি পাবেন কোথায় ?তিনি হাঁটতে লাগলেন । কিন্তু এগুতে পারছিলেন না । শরীরটা ক্লান্তিতে যেন ভেঙ্গে যাচ্ছে । তিনি পানি পানি বলে চিৎকার করতে লাগলেন । কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছে না । হঠাৎ তার চোখে পড়লো অনেকদূরে একটি ঝরণা রয়েছে । তিনি তৎক্ষণাত দৌড়িয়ে সেখানে গেলেন । কিন্তু দু্র্ভাগ্য , এখানেও পানি মিললো না । অবশেষে তিনি আশা ছেড়ে দিলেন । মৃত্যুর আশা করতে লাগলেন । যেই না মাথার মধ্যে মৃত্যুর ।কথা আসলো অমনি তার মনে পড়ে গেল , তিনি তো নামাজ ,রোজা ,যাকাতসহ কোনো ইবাদাতই আদায় করেন না । তাহলে এখন উপায় ? তখনি দূর থেকে একজন ব্যাক্তিকে আসতে দেখা গেল । তিনি খুবই দুর্বল একটি ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে আছেন । তার নিজের শরীরটাও খুব দুর্বল ।উক্ত ব্যাক্তি এসে বললেন, তুমি এখান থেকে জলদি পালাও । ভয়ংকর বিপদ আসছে । সালমানের বাবা বললেন, আমার কাছে পালানোর মতো কোনো শক্তি নেই । বৃদ্ধ লোকটি বললো , তাহলে দুংখিত বাবা । আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না । এই বলে লোকটি ফিরে যেতে উদ্যত হলো ।সালমানের বাবা তার পায়ে পড়ে বললো , প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন । যত টাকা-লাগে আমি দিবো । বৃদ্ধ লোকটি বললেন , এই মরুভূমিতে টাকা-পয়সা দিয়ে কখনো বাঁচা যায় না । সেজন্য সহায়-সম্বল এবং শক্তি-সামর্থ্যের প্রয়োজন ।
কিন্তু আমার নিকট এই জিনিষগুলো নেই । তাই আজ আপনাকে বাঁচাতে পারলাম না । এই বলে বৃদ্ধ লোকটি ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো । সালমানের বাবা অনেক ডাকলেন । কোনো লাভ হলো না । এদিকে পিপাসায় তার গলা কাঠ হয়ে গেছে । তিনি চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে লাগলেন । তার বেঁচে থাকার ইচ্ছা শেষ হয়ে গিয়েছে । আজকে হয়তো তিনি এখানেই মৃত্যুবরণ করবেন । তিনি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে লাগলেন । কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না । কল্পনায় তিনি আজরাইলকে দেখতে লাগলেন । মনে মনে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে লাগলেন । কিন্তু তিনি কি ক্ষমা করবেন ? সারা জীবন তো তার নাফরমানিই করে গিয়েছেন তিনি ।
হঠাৎ করে কিসের সাথে যেন মাথায় আঘাত খেলেন । সাথে সাথে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল । এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি । এই মরুভূমির স্বপ্ন দেখে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে । তিনি উঠে ডাইনিংরুমে যাওয়ার সময় দেখেন , সালমান নামাজ পড়ছে । দেখে তার পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল । একটা সময় খুব ইবাদাত বন্দেগী করতেন । কিন্তু হঠাৎ একদিন এক ল্যাংটা পীরের সাথে দেখা । তিনি বললেন, নামাজ-রোজা লাগবে না । শুধু মাজারে গিয়ে সেজদা দিলে আর মাজারে মান্নত করলে মনের সকল আশা পূরণ হয়ে যাবে । তারপর তিনি তার স্ত্রীসহ ওই পীরের মুরীদ হলেন । ওই পীর একদিন বললেন, যারা নামাজ পড়ে তারা রাজাকার । এরকম অনেক ভ্রান্ততার কথা সালমানের বাবার মনে পড়তে লাগলো ।
তিনি অজু করে জায়নামাজ নিয়ে নামাজে দাড়ালেন । তখন যেন এক নির্মল শান্তি তাকে ঘিরে নিলো । অন্তরের সমস্ত পেরেশানী নিমিষেই দূরিভূত হয়ে গেল । এক বেহেশতি পরিবেশ যেন তাকে আহ্বান করছে , আসো আমার নিকটেই আসো । আমাকে তোমার রব তো তোমার জন্যই বানিয়েছেন । তারপরও তুমি আমাকে ছেড়ে অন্যায় কাজ করে জাহান্নামের দিকে কেন যাচ্ছ ? কেন বারবার শয়তানের ধোকায় পড়ে তুমি নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ ? তুমি কি ফিরে আসবে না ? তুমি কি সংশোধিত হবে না ?

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন