কাজের মেয়ে - হেমায়েত উদ্দীন বিন আব্দুল্লাহ
ইসলাম রাজা-প্রজা, গোলাম-মুনিব সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদিও বিংশ শতাব্দীর পূর্বেই
দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমান সমাজ দেখলে মনে হয় , ইতিহাসে পড়া জাহেলি যুগের দাস প্রথার ডিজিটাল সংস্করণ হচ্ছে, কাজের বুয়া বা গৃহস্থকর্মী। দৈনিক খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে
গৃহকর্মী অকল্পনীয় নির্যাতনের বাস্তব চিত্র। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আরব দেশগুলোও
কোনো অংশে পিছিয়ে নেই এই নির্যাতনের অমানবিক প্রতিযোগিতায়। অথচ এই আরব-ভূ-খন্ডেই আবির্ভূত
হয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ সা.। যিনি সমাজ থেকে সকল
বৈষম্য ও অমানবিকতাকে বিদূরিত করে দিয়ে গিয়েছেন।
গত কয়েকমাস পূর্বে আমাদের পাশের বাসায় মিতু কাজের মেয়ে হিসেবে আসলো । তার আসার আগেও এ বাসায় একটি কাজের মেয়ে ছিল। তার ইতিহাস আরো করুণ। সেই মেয়েটির নাম ছিল আরিফা। সেই মেয়েটির মুখ থেকে শোনা কিছু কথা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। একবার মেয়েটির উপর তার মালকীন গরম ভাতের মাড় ফেলে দেয়, এতে মেয়েটির কোমর থেকে পা পর্যন্ত ঝলসে যায় । কিন্তু তার পরেও তাকে ডাক্তারের নিকট নেওয়া হয়নি। বরং "টুথপেস্ট" লাগিয়ে এর চিকিৎসা করা হয় । আর প্রতিদিন দুইবেলা না গায়ে হাত না তুলতে পারলে মনে হয় , কাজের মেয়ে রাখার মজাই পায় না। ফজর থেকে শুরু করে রাত বারোটা পর্যন্ত একটানা কাজ করেও খাবার জুটে বাড়ির লোকদের উচ্ছিষ্ট খাবার। তাও পেট ভরে নয়। দুই ঈদে যখন বাসার লোকেরা গ্রামে চলে যায়, তখন মেয়েটাকে একা বাসায় তালা মেরে যায়। কারণ একবার যদি মেয়েটা গ্রামে চলে যায়, তাহলে তো কোনোদিনও সে এবাড়িতে আসবে না। বাড়ি থেকে যখন মা-বাবা মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য ফোন করতো , তখন মেয়েকে বলতো , 'সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবি'। পাছে যদি আড়ালে গিয়ে বাবা-মাকে কষ্টের কথা বলে দেয় ! |
এরকম বহু কষ্টের পরও আরিফা মেয়েটি ছয় বছর ছিল । না থেকে আর উপায় কী!। অন্যত্র থাকার বা যাওয়ার কোনো জায়গা নেই । আর পাশের বাসায় যাওয়া তো তো
দূরে থাক! কথা বলাও যেন হারাম! এ যেন কোনো
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আরিফা চলে যাওয়ার পর আসলো মিতু। কিন্তু সে অল্পবয়সী এবং
দুর্বল হওয়ায় সে আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারলো না। মাত্র ছয় মাসের মাথায় চলে যেতে
হলো গ্রামের বাড়িতে। এখানে মাত্র দুটি মেয়ের কষ্টের কথা আংশিক উল্লেখ হলো । এরকম কত আরিফা, মিতু নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করে আমাদের সমাজে বাস করে
যাচ্ছে,
তার হিসাব কে রাখে! তাদের বুক ফাটা নীরব কান্নার আওয়াজ
রাত্রি-আধারের নিস্তব্ধতায় মিশে যায়। আমরা তাদের এতটুকুও অনুভব করতে পারি না।
আল্লাহ তা'আলা সকল মজলুম ও অভাবীর সহায় হোন ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন