সম্পাদকীয়

দিন জুড়ে বৃষ্টি আর মেঘের একচ্ছত্র আধিপত্য। তেজস্বী রবিরশ্মির আলোকবিভাও বড্ড ম্লান। তবে সময়ে-সুযোগে উঁকি দিয়ে তার অস্তিত্বের কথা জানান দেয় সে। খাল-বিল নদী-নালা জলের প্রতুলতায় টাইটুম্বুর। বৃক্ষলতা পূর্ণ সজীবতা নিয়ে সাজে নতুন রূপে। মৃত নদীর কোলে জোয়ার উঠে, ফিরে পায় তার হারানো যৌবন। খাল-বিল ও পুকুরের রূপ রস আর সৌন্দর্য্য নিয়ে দৃষ্টি জুড়ায় শাপলাপদ্মফুল।

বৃষ্টিজলে আবগাহনে মনে জেগে ওঠে অফুরান আনন্দের শিহরণ। টিনের ঘরে শুনতে পাওয়া যায় বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দ।

যে ছন্দে কারো হৃদয়ের মণিকোঠায় অনুভূত হয় বিরহ-যাতনা, কিংবা কারো হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হয় ভালোবাসার নতুন অঙ্কুর, কিংবা কারো হৃদয়ে জাগে রোমাঞ্চ! তবে বর্ষার সাথে ভালোবাসার একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। তাই একে প্রেম বিরহ ও সৃজনক্রিয়ার ঋতু অভিধায় আখ্যায়িত করা হয়েছে।

কবিলেখকরা সকলেই বর্ষা-বন্দনায় আপ্লুত হয়েছেন। তাইতো দেখা যায়, এই ঋতু নিয়ে কোনো পঙক্তি লেখেনি এমন কবি-লেখক পাওয়া দুষ্কর। বর্ষা নিয়ে মহাকবি কালিদাস রচনা করেছে বিখ্যাত মহাকাব্য 'মেঘদূত' এছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলীতেও বিরহের সঙ্গে বর্ষার নিবিড় একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছেন পদকর্তারা। পদাবলী সাহিত্যের মহাজন বিদ্যাপতি চন্ডীদাস জ্ঞানদাস বিহারীলাল  সৈয়দ সুলতান, আকবর, ফয়জুল্লাহ, আফজল, সালেহ বেগ, নাসির মাহমুদ, সৈয়দ আইনুদ্দীন, আলীরজা, করম আলীর কবিতায় বর্ষা এসেছে একাধিকবার। এই সময়ে বর্ষা যেন প্রিয়জনের আরাধনার উৎকৃষ্ট সময়। ভাবনার নিরবচ্ছিন্ন উপলক্ষ্য। বিরহ-স্রোতে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন বিপরীত ধারায়। আবেগ আর ভালবাসার কথা লিখেছেন হৃদয়ের গহীন থেকে।

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে,"

"ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল, চোখের উপরে,"

"তার শান্ত-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছি, আবেগের ভরে,"

"ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে!

ঋতুরঙ্গ মঞ্চে রুদ্র ভয়াল গ্রীষ্মের বিদায়ের পর শ্যামগম্ভীর বর্ষার আগমন। আষাঢ়স্য পহেলা দিবসে ঘন-গৌরবে নবযৌবনা বর্ষার যাত্রা শুরু। পঞ্জিকার হিসেবে বর্ষার মেয়াদ দু'মাস হলেও আক্ষরিকার্থে তার ব্যাপ্তি প্রায় চারমাস। এই দীর্ঘ সময়ে সবাই অন্য পৃথিবীর স্বাদ পেয়ে থাকে। অলস মধ্যাহ্নে কৃষাণ আর মাঝির কণ্ঠে ক্ষীণ-সুরে সৃষ্টি হয় অলৌকিক আবহের। অবশ্য বর্ষা সবার কাছে সবার আবেগের মতো, সমভাবে ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেয় বাতাসের পরতে পরতে। হঠাৎ কারও বিরহের কথা স্মরণে আনে, কারো আসে প্রিয়জন হারানোর কিংবা বিচ্ছেদের মর্মান্তিক ঘটনা, কারো মাঝে জেগে ওঠে ভালোবাসার সুপ্তপ্রতিক্রিয়া, কিংবা কারো আত্মা-মনন বর্ষার পবিত্র জলে ধুয়ে নির্মল হয়ে যায় সকালের স্বচ্ছ আকাশের মতো শুভ্রনীল।

বর্ষা নিয়ে লিখবার অনেক কিছুই আছে, তবে মনে হয় না এটা সেই ফিরিস্তি লেখার জায়গা!  তাই বর্ষা-বন্দনার এখানেই ইতি।ঈষৎ বিবরণ দিই আমাদের আয়োজনের সূচনা সম্পর্কে, বর্ষার অবিরত শীতল বর্ষণের এক সন্ধ্যায় নির্বাহী সম্পাদকের সাথে আলাপে আলাপে এই আয়োজনের কথা উঠে আসে, নির্বাহী সম্পাদক খুবই কর্মঠ মানুষ, তিনি সাথে সাথে কাজ শুরু করে দিলেন।পরদিনই লেখা আহ্বান দেওয়া হলো। সবার জন্য উন্মুক্ত একটা প্লাটফর্ম তৈরী হল। আমি শুধু তাল মিলিয়েছি। সেদিনই নদীর সাথে  যুক্ত হল এক ঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ। সবাই নবীন। যারা জ্ঞান সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়। যাদের মেধার উপর নির্ভর করে সাজবে আগামীর সমাজ, জাতি ও দেশ। এখানে সকলের আবেগ বিশ্বাস আর চেতনা যূথবদ্ধ। এখানে কিশোর-কিশোরী যেমন অংশ নিয়েছে, তেমনি অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্য থেকে যারা তারুণ্যের সীমান্তে নবীন। সবার প্রচন্ড ইচ্ছেশক্তির কল্যাণে সৌন্দর্য্যমণ্ডিত হয়েছে। আমরা শুধু চেয়েছি নব্য-তারুণ্যের দীপ্তিকে বিকশিত করতে। এজন্য সাহিত্যপাঠ-আর জ্ঞান আহরণের বিকল্প নেই। সাহিত্য মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটায়। সাহিত্য শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা মেটায় না, সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে আমরা সর্বকালীন মানুষ এবং অতীতের জীবন ধারাকে যেরকম উপলব্ধি করতে পারি তেমনি অন্য ভাষার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে অন্যান্য দেশের জীবনধারা সম্পর্কেও জানতে পারি।

অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এর নাম দেওয়া হলো নদী এর দুটো অর্থ হতে পারে, আগে 'নদী'র কথাই বলি! নদী কখনো মরে না। নদী কোন আবিলতা কিংবা কদর্যতায় মলিন হয়না, বরং সকল কদর্যতার অস্তিত্বের বিনাশ ঘটে এখানে। নদীর লক্ষ্য সু-স্থির, সুদৃঢ় ; যেকোন মূল্যেই তাকে পৌঁছাতে হবে সাগরে। বাঁধ কিংবা পার; কোনটাই তার পথ রুদ্ধ করতে পারেনা। অবিরাম সে তার পথে চলছে। আমাদের নদীও পথ চলা হোক অবিরাম, ক্লান্তহীন! যেদিন এই নদী কোন এক সাগর-সায়রে  মিলবে, সেদিন আমরা এর সার্থকতা খোঁজব। কুসুমাস্তীর্ণ হোক এর পথ চলা!

নদীকে ভাঙ্গলে নবীন দীপ্ত নবীন দীপ্ত হল একদল অভিযাত্রী। এই অভিযাত্রায় একত্রিত হয়েছে প্রাণশক্তি আর উদ্যমতা ভরপুর কিছু প্রদীপ। যারা তমাচ্ছন্ন পথের অশুভ শক্তিকে রোধ করতে যাত্রা করেছে আলোর মশাল নিয়ে। এযাত্রা নবীন, মেধাবী, পরিশ্রমি, সহনশীল, কর্মঠ, একনিষ্ঠ সাহিত্যানুরাগী সকলের জন্য উন্মুক্ত। এযাত্রা নিয়ে আমরা শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরদের সেই মিছিলে। আমরা হবো চৌদ্দশ বছরের এক কাফেলা!

আমাদের এ আয়োজন সাহিত্যকে কেন্দ্র করে। আর ইসলামেও সাহিত্যের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সাহিত্যের যুগে সাহিত্যশক্তি নিয়ে প্রেরিত  হয়েছিলেন। তার যুগ ছিল কবিতার ছন্দ উপমা শব্দ উৎপ্রেক্ষা ও বাণী প্রকল্পে প্লাবিত। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহিত্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে আনা আফসাহুল আরব

আমাদের এই সাহিত্যচর্চার প্রধান অনুষঙ্গ উপজীব্য হয়ে উঠুক পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধতম, শ্রেষ্ঠতম মানুষটির আদর্শ তাঁর নীতি-আচরণ এবং ভরে উঠুক আমাদের হৃদয় তাঁর সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা আর প্রীতিতে। যে কেন্দ্রবিন্দুতে এক হয়েছে দেড়'শ কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

উপসংহার, প্রবাদ আছে ছোট ছোট স্রোতে একটি বড় নদীর জন্ম হয়, আমরা এখানে সেই ছোট ছোট স্রোতগুলোকে একত্রিত করতে চেয়েছি। বয়স দশেরও কম, এমন ছোটরাও এখানে লিখেছে। সর্বোচ্চ পঁচিশ উর্ধ্বও কেউ নেই। তাই এতে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা স্বাভাবিকের বহির্ভূত কিছু নয়। এখানে যারা লিখেছেন তাদের সকলকেই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া।

এ আয়োজনের সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা দোয়া ও ভালোবাসা রইলো!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শৈশবের স্কুল জীবন - আবু তাহের ইসলাম

হারানো দিনের বন্ধুত্ব - সানজিদা হোসাইন

মা - মীম আক্তার সামিয়া